• ১৫ই জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ , ৩১শে আষাঢ়, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ , ৯ই মহর্‌রম, ১৪৪৬ হিজরি

“অপারেশন ফার্মগেট” ৭১ এর এক দুঃসাহসী অপারেশন

নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত আগস্ট ৮, ২০১৯
“অপারেশন ফার্মগেট” ৭১ এর এক দুঃসাহসী অপারেশন

৮ই আগস্ট, ‘অপারেশন ফার্মগেট’ খ্যাত দুর্ধর্ষ গেরিলা অভিযানের ৪৮ তম বার্ষিকী। অবরুদ্ধ ঢাকার বাসিন্দা’দের ভেতর তখন শুধুই নির্যাতনের ভয় ও মৃত্যুশঙ্কা। তবুও, মানুষ আশাবাদী হতে পেরেছিল সেদিন। কারন, মৃত্যুপুরী ঢাকায় স্বাধীনতাকামী দুর্ধর্ষ গেরিলাদের দ্বিতীয়বারের মতো সরব ও প্রত্যক্ষ উপস্থিতি।

৪৮ বছর আগে,এইদিন পাকি হার্মাদ’দের উপস্থিতির মাঝে পরাধীন ঢাকাবাসী প্রত্যক্ষ করেছিল ঢাকার অন্যতম স্মরণীয় গেরিলা অপারেশন। উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের জুন মাসের মাঝামাঝি ও জুলাই মাসে মেলাঘর থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে গেরিলা যোদ্ধাদের অগ্রবর্তী দল (মূলতঃ এ দলটিকেই ক্র্যাক প্লাটুন বলে অভিহিত করা হয়) ঢাকায় প্রবেশ করে।

উল্লেখ্য যে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে ঢাকায় সমুখ যুদ্ধ হয়নি। কিন্তু, পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে জুলাই মাস থেকে ডিসেম্বরে চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হবার মুহূর্ত পর্যন্ত তটস্থ করে রেখেছিলেন ‘গেরিলা’ যোদ্ধারা।

এবং একাত্তরের আগস্ট মাস জুড়ে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী’র অমানুষেরা বিস্ময়ের সাথে দেখেছিল একের পর এক দুঃসাহসী গেরিলা অভিযান পরিচালিত হচ্ছে ঢাকা জুড়ে, এমনকি দিনের বেলাতেও।

“অপারেশন ফার্মগেট”

৮ই আগস্ট ১৯৭১। রাত ৮ টা বেজে ৭ অথবা ১০ মিনিট। ফার্মগেট রাজধানীর কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল, এর অদূরেই ক্যান্টনমেন্ট।

ফার্মগেট অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন ক্র্যাক প্লাটুনের ৬ জন গেরিলা মুক্তিয়োদ্ধা । শহীদ বদিউল আলম বদি বীর বিক্রম, শহীদ আবদুল হালিম চৌধুরী জুয়েল বীর বিক্রম,হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক,পুলু ,কামরুল হক স্বপন বীর বিক্রম এবং আবদুস সামাদ বীর প্রতীক।

একাত্তরের ২৫শে মার্চের রাতে, পাকিস্তানী হিংস্র পশুদের অমানবিক, নির্দয়, পাশবিক হত্যাযজ্ঞের পর ঢাকার ফার্মগেটে একটি চেকপোস্ট স্থাপন করেছিল পাকিস্তানী সেনাবাহিনী। সে সময় নির্মাণাধীন আনন্দ সিনেমা হলের উপরে ছিল মেশিনগান। তার থেকে সোজা বরাবর সামনে ট্রাফিক আইল্যান্ডে তাঁবু খাটানো ফার্মগেটের চেকপোস্ট। ভেতরে বাইরে ভারি ও হাল্কা অস্ত্র হাতে সজ্জিত পাকি মিলিটারি ও স্বদেশী বেঈমান রাজাকারদের দল। ফুটপাথে চলমান টহল বজায় রেখেছে এরা।

মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৭ই আগস্ট অপারেশনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল আবদুস সামাদের ইস্কাটনের বাসায়। সারাদিন ব্যাপী রেকি করলেন হাবিবুল আলম, মায়া চৌধুরী, এবং বদিউল আলম। পুরো ফার্মগেট রেকি করা হয়। সারাদিন সবকিছু পরিকল্পনামাফিক হলেও, সন্ধ্যার দিকে মিলিটারি পুলিশের টহল বেড়ে গিয়েছিল। এমতাবস্থায় স্বচক্ষে দেখে এলেন হাবিবুল আলম, বদিউল আলম এবং কামরুল হক স্বপন। অভিযান অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বোধ হওয়াতে এবং সাধারন মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হবে বলে দিনের বেলায় আক্রমণের সিদ্ধান্ত পেছানো হয় এবং ৮ই আগস্ট আক্রমণের তারিখ পুনঃনির্ধারণ করা হয়।

৮ই আগস্ট, সন্ধ্যা ৭ঃ১৫ মিনিটে জিরো আওয়ার নির্ধারণ করেন গেরিলারা। ১৯৬৫ সাল মডেলের একটি ‘মেটালিক গ্রিন’ টয়োটা সেডান গাড়িতে করে তাঁরা অভিযানে বের হন। গাড়িটি আবদুস সামাদ বীর প্রতীকের, এবং তিনি সেদিন অসাধারণ দক্ষতায় গাড়ি চালিয়েছিলেন। অভিযানে অংশ নেয়া সকল গেরিলার মাঝে তিনি ছিলেন বয়স্ক সদস্য।

ইস্কাটন থেকে গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে তৎকালীন পাক মোটরে এসে (বাংলা মোটর) ডানে মোড় নিয়ে ধীরগতিতে এগুতে থাকে। এসময় বর্তমান সোনারগাঁও হোটেলের কাছে ‘দারুল কাবাব’ রেস্তোরাঁর সামনে দুটি জীপ গাড়িতে পাকিস্তানী সেনাদের দেখা পাওয়া যায়। তারা জীপে বসে পা ছড়িয়ে কাবাব খাচ্ছিল। রাস্তাটি সেসময় ময়মনসিংহ রোড ( বর্তমান কাজী নজরুল ইসলাম অ্যাভিনিউ) নামে পরিচিত ছিল।

সেদিন, গেরিলারা গাড়িতে করে তেজকুনিপাড়ার বেশ কিছু রাস্তা ঘুরে হলিক্রস স্কুল পেরিয়ে ফার্মগেটের মুখে থামলো। ড্রাইভিং করছিলেন সামাদ, পাশে জুয়েল, পেছনে বদিউল আলম, হাবিবুল আলম, পুলু, আর স্বপন। অমিয় তেজী গেরিলা, বদিউল আলম ক্ষিপ্র গতিতে গাড়ি থেকে নেমে এলেন, একই সাথে বাকি আলোর পথের যাত্রীরা। চোখের পলকে অবস্থান নিতেই গর্জে উঠলো পাঁচটি স্টেনগান ও এলএমজি।

প্রায় সোয়া মিনিট স্থায়ী এ অভিযানে, গেরিলা’দের বার্স্টফায়ারে মুহূর্তের মাঝে পাঁচ (৫) পাকিস্তানী সেনাসদস্য কাটা কলাগাছের মতই মাটিতে পড়ে, সাথে আরও নিহত হয় ছয় (৬) দেশীয় বেঈমান রাজাকার। প্রত্যক্ষদর্শী’র বর্ণনা থেকে জানা যায়, অভিযান শেষে পাকিস্তানী সেনারা ট্রাকে করে ছুটে আসে, বালতি বালতি পানি ঢেলে রক্ত পরিষ্কারের চেষ্টা করেছিল।

এই গেরিলা অপারেশন,ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল পুরো ঢাকায়। নতুন উদ্যম যোগ করেছিল গোটা দেশের মুক্তিকামী জনমানুষের মনে। খোদ ক্যান্টনমেন্টের এত নিকটে এমন দুর্ধর্ষ গেরিলা অভিযান খোদ পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর কাছেই ছিল অবিশ্বাস্য এক ঘটনা।

পরদিন ঢাকা শহরব্যাপী পাকিপশুদের চোখেমুখে আতঙ্ক ছিল স্পষ্ট। চেকপোস্টে পাকি অমানুষরা ছিল গরহাজির, ফার্মগেট ছিল জনশুন্য।

অপারেশন ফার্মগেটের ৪৮ তম বার্ষিকীতে, সকল শহীদ ও বেঁচে থাকা গেরিলা যোদ্ধাদের প্রতি আমরা হৃদয়ের গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জ্ঞাপন করছি।

তথ্য সূত্র ও কৃতজ্ঞতাঃ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী তেজকুনিপাড়ার স্থায়ী বাসিন্দা স্বর্গীয় জন স্যামুয়েল গমেজ (২৭ এপ্রিল ২০১৮, তাঁর দেহাবসান হয়েছে)।

‘Brave of Heart’– Habibul Alam BP

বিচ্ছুদের কাহিনীঃ দৈনিক বাংলা ১৯৭২

July 2024
S S M T W T F
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031